খুলনা জেলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি নিম্নাঞ্চল বিল ডাকাতিয়া। এই বিল গাঙ্গেয় জোয়ারভাটা বিধৌত বদ্বীপীয় সমভূমির অন্তর্গত। খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী ও আড়ংঘাটাথানা এবং জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা, যশোর জেলার কেশবপুর, মণিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলার অভ্যন্তরের প্রায় সিয়াত্তর হাজার একর জমি নিয়ে গঠিত বিল ডাকাতিয়া। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ বিলটি আশির দশকে স্থানীয় মানুষের জন্য অভিশাপ হিসাবে দেখা দেয়।
এই বিলের প্রাথমিক অন্তঃপ্রবাহ – শৈলমারি, হামকুড়া, হরি, সালতা, ভদ্রা ও ভৈরব নদী। বহিঃপ্রবাহ- কৈয়া, ময়ূর ও হাতিয়া।
এই বিল ডাকাতিয়ায় ৮০’র দশকেও ফসল হতো তিনটি। ১৯৮৪ সালে বন্যায় বিল ডাকাতিয়া অঞ্চল প্লাবিত হয়। স্থানীয় অধিবাসীরা সাতক্ষীরা সড়কের শলুয়া এবং আমভিটা বেড়িবাধে আশ্রয় নেয়। দুর্যোগে বিল ডাকাতিয়াসহ আশেপাশের ৭৬ হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয়। প্রায় এক যুগ ধরে জলাবদ্ধতা স্থায়ী হয়।
১৯৮৮ সালে কৃষক সংগ্রাম সমিতি এবং বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বিশ হাজার লোকের সমন্বয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে এই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানান। তৎকালীন শাসক সরকার এরশাদের আমলে ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করলেও জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়। এই প্রকল্পের পিছনে তৎকালীন মন্ত্রী লেঃ কর্নেল এইচ এম এ গাফফার (বীর উত্তম) এর অভূতপূর্ব অবদান ছিল। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দলীয় কিছু স্বার্থান্বেষী নেতা থুকড়া বাজারে মহাসমাবেশের ডাক দিলে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। এই বাঁধা অতিক্রম করে মহাসমাবেশ করে। এই আন্দোলন ছিল প্রকৃতপক্ষে আত্মঘাতী। এরশাদ সরকারের সেদিনের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে হয়ত আজকে বিল ডাকাতিয়া এলাকার মানুষের বর্তমানের দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ইমার্জেন্সি অ্যাকশন প্ল্যানের আলোকে ১৯৯২-৯৩ সালে নেয়া হয় খুলনা-যশোর পানি নিষ্কাশন পুনর্বাসন প্রকল্প (কেজেডিআরপি)। এর আগে আরো দুটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সরকারি প্রায় প্রতিটি প্রকল্পই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তবে শলুয়া স্লুইচ গেট হতে কৈয়া নদী খনন এবং শলুয়া থেকে বিল ডাকাতিয়ার মাঝখান দিয়ে ফুলতলা উপজেলার জামিরা পর্যন্ত ৮০ ফুট চওড়া খালটি খননের পর থেকেই বিল ডাকাতিয়ার পানি নিষ্কাশন মোটামুটি চলতে থাকে। এই ৮০ ফুট খালটির পানি শলুয়া গেট দিয়ে বের হওয়ার কথা। কিন্তু গত বছর এই গেটটি খুলতে গিয়ে স্থানীয় জনগণের বাঁধার মুখে পড়তে হয়। তারা মনে করে এই গেট দিয়ে পানি ছেড়ে দিলে তাদের মাছের ঘের ও জমি তলিয়ে যাবে। পরবর্তীতে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের হস্তক্ষেপে মোটামুটি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু এই বছর শলুয়া গেট সম্পূর্ণ বন্ধ। এখানে জিজ্ঞাসা- কোটি কোটি টাকা খরচ করে ৮০ ফুট দৈর্ঘ্য খাল খনন করে গেট বন্ধ গেটের সংযুক্ত খাল ইজারা দিয়ে মাছ চাষ হচ্ছে। এই ইজারাকে এবং কেন দেয়, ইজারাদার কারা ও এর সুবিধাভোগী কতজন। এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?
গত বছর সরকার শৈলমারীতে দুটি মোটামুটি ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশন করছে। কিন্তু এতবড় বিলের জন্য এই দুটো পাম্প প্রয়োজনের তুলনায় নস্যি। তাছাড়া এই পাম্পের মুখে পর্যাপ্ত পানি যাওয়ার পিছনে অন্তরায় হয়ে আছে বিভিন্ন খালের ইজারাদার। অর্থাৎ মাছ আটকানোর পাটা, বাঁধ ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা।
বিল ডাকাতিয়ার সমস্যা নিরসনে বিগত কয়েকটি সরকারের মধ্যে এরশাদ সরকারের মহা পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছিল তৎকালীন বিরোধী দলীয় কিছু স্বার্থান্বেষী নেতার কারণে। প্রেসিডেন্ট জিয়া ও খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে এই এলাকায় বেশকিছু নদী খনন অকার্যকর হয় ফারাক্কার অভিশাপে। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বিল ডাকাতিয়া নিয়ে তেমন কোনো মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি।
বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসনের কিছু প্রাথমিক প্রস্তাবনা তুলে ধরতে চাই।
প্রথমত : পানির সঠিক প্রবাহ চালু রাখতে অবিলম্বে সকল খাল ও সংযোগ উন্মুক্ত করতে হবে। ইজারার নামে কোনো খালে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত : শলুয়ার স্লুইস গেট প্রয়োজনমতো খুলে রাখতে হবে এবং পানি বের হওয়ার পথ সুগম করতে হবে।
তৃতীয়ত : সকল ছোট ছোট বিলে একটির সাথে অন্যটির সংযোগ স্থাপন করতে হবে।
চতুর্থত : শৈলমারী পাম্পে পর্যাপ্ত পানি যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক অধিক শক্তিশালী পাম্প স্থাপন করতে হবে।
পঞ্চমত : পাম্প থেকে নির্গত পানি শৈলমারী নদীতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ষষ্ঠত : দলমত নির্বিশেষে জনগণ, সরকার, প্রশাসন সকলকে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসন হবে। পরবর্তীতে যদি কখনো সারা দেশের নদনদী আবার নিজ রূপে ফিরে আসে তখন বিল ডাকাতিয়া নিয়ে নতুন চিন্তা করা যাবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা।
খুলনা গেজেট/এনএম

